অভিষেক রায়


                           ইসরায়েল ও প্যালেস্তাইন- একটি ভ্রমণগদ্য 

By the rivers of Babylon, there we sat down, yea, we wept, when we remembered Zion. –Psalm 137

                                               -প্রাক উৎসর্গপত্র, পুরী সিরিজ, উৎপলকুমার বসু

২০১৬ সালের জুন-জুলাই মাস নাগাদ ইসরায়েলের হিব্রু ইউনিভার্সিটি অফ জেরুসালেমে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। আমি ও আমার স্ট্যাটিস্টিকালের এক সিনিয়র, অভিনন্দন’দা। ইউনিভার্সিটির ভেতর "ইসরায়েল ইন্সটিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিস"-এ ছিল আমাদের কাজ। ঐতিহাসিক "অ্যারো লেকচার" অ্যাটেন্ড করা ছিল সেই কাজের অন্যতম অংশ। অর্থনীতিতে সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল জেতার কেরামতি যে কেনেথ অ্যারোর তার-ই নামে এই লেকচার। তিনি নিজেও আমাদের সাথে আমাদের-ই পাশে বসে শুনলেন লেকচারের বিষয়বস্তু মনোযোগ দিয়ে। তখন তার পঁচানব্বই-য়ের উপরে বয়স (এই বছরের শুরুতেই তিনি মারা যান।)   ইসরায়েলের ইতিহাস তিন সহস্রাব্দের, উপরন্তু পশ্চিমী দুনিয়ার ধর্মীয় রাজধানী ও যুদ্ধ বিগ্রহের জন্য কুখ্যাত। ফলে অভিনন্দন'দা ও আমার, দুজনেরই এই বিষয়ে উৎসাহের সীমা ছিল না। ভিসা করতে সমস্যা হয়, দিল্লী গিয়ে প্রাসাদোপম ইসরায়েলি ভিসা অফিসে ইন্টারভিউ দিতে হয়। সেই কি নিরাপত্তার কড়াকড়ি! পড়ে বিমানে চড়ার সময়েও এই বাড়াবাড়ি রকমের নিরাপত্তা টের পাই, যা সচরাচর অন্য ইন্টারন্যাশানাল ফ্লাইটে দেখা যায় না। অভিনন্দন'দা-র সাথে আলোচনা হয় যে এই আচরণ যুদ্ধবাজ ইসরায়েলের কর্মফল হেতু ভয়ের আত্মপ্রকাশ কিনা! এ বিষয়ে সম্যক নিরপেক্ষ জ্ঞান অবশ্য ইসরায়েল পৌঁছেই হয়েছিল আমাদের দু'জনেরি, সে ব্যাপারে পরে বলব।   ভিসা অফিসের সুন্দরী ইহুদী মহিলা শুরুতেই আমাদের সাবধান করে দ্যান টাকা পয়সার ব্যাপারে, সুতরাং ইসরায়েল ভ্রমণ যে আর্থিক দিক দিয়ে বেশ খরচ সাপেক্ষ হতে চলেছে, এই ব্যাপার বোঝা যায়। যদিও খরচ বেশীটাই উঠে এসেছিল হিব্রু ইউনিভার্সিটির স্কলারসিপের টাকায়।  মুম্বাই হয়ে কানেক্টিং ফ্লাইটে ইসরায়েলের তেল আবিব বিমানবন্দর।  সেখান থেকে বেরিয়ে জেরুসালেম যাওয়ার পালা। জেরুসালেম শহরের নতুন যে অংশ তার খাস প্রাণকেন্দ্রে আমাদের বিলাসবহুল সাত তারা হোটেল।
হোটেলের জানালা থেকে মর্ডান জেরুসালেম
হোটেল অবধি পৌঁছবো কি করে, শেষমেশ শাটেলের ব্যবস্থা  হল ৬০ শেকেলের বিনিময়ে । আসতে আসতে দেখছিলাম অনুচ্চ ক্ষয়িষ্ণু টিলা বা মালভূমি অঞ্চলের  ওপর জেরুসালেম শহরটার অবস্থান, আশপাশের চাইতে কিছু উঁচুতে। প্রদক্ষিণ করে করে, পাহাড় কেটে রাস্তা উঠেছে। নয়নাভিরাম। ঐতিহাসিক পুরোনো জেরুসালেমও  এর মতই একটা টিলার উপর অবস্থিত, তার নাম ইতিহাসের ছাত্রের সুপরিচিত, “টেম্পেল মাউন্ট”। লক্ষ্য করছিলাম যে এই পাহাড় গুলোর উপাদান এক ধরণের ধলা লাইমস্টোন, হলুদ ও অফ হোয়াইট হয় তার রং। এর নাম জেরুসালেম স্টোন। ওল্ড টেস্টামেন্টের একটা ফিলিং আসে এই রংটা দেখলে। মূলত এই রঙের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমেই আমাদের ভ্রমণের স্বাদ পাওয়া শুরু হল।


জেরুসালেমের প্রাচীন নাম “উরুসালিমা”, শান্তির শহর। সন্ধ্যের পর  এই দিকে একটা হাওয়া দিয়ে থাকে তা অতি মোলায়েম, সম্ভবত আমাদের দক্ষিণা বাতাসের থেকেও  একশ গুণ মিষ্টি, জেরুসালেমবাসী কে তা সন্ধ্যের পর থেকে মিলনাকাঙ্খী করে তোলে, “দ্য এয়ার অফ জেরুসালেম ইস ওয়াইন”, আমাদের মনে হল হয়তো তার ফলেই এই নামকরণ। জেরুসালেমের রং আদতে লাইমস্টোনের রং। বাড়ি-ঘর-দোরের অফ হোয়াইট গাত্রই সুর বেঁধে দিয়েছে পুরো শহরের। কর্পোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী নতুন শহরেরও বাড়ি-ঘরের বাইরের দেওয়ালে এই লাইমস্টোন ব্যাবহার বাধ্যতামূলক।  ফলে নতুন শহরেও একটি ঐতিহাসিক স্বাদ এসেছে, পুরনো শহরের মতো ঈষৎ হলুদাভ হয়ে উঠতে পেরে।

বাজার এলাকায় শহরের রাস্তাঘাট

 হলুদ-অফ হোয়াইট আরও মায়াবী হয়ে ওঠে সন্ধ্যের পর হ্যালোজেনে। জেরুসালেমে নিয়ন নেই। সর্বত্রই এই হ্যালোজেন আর প্রত্নতাত্বিক লাইমস্টোন!
হ্যালোজেনের আলোয় 
এই ঐতিহাসিকতার ব্যাকড্রপে অর্থোডক্স ইহুদীদের সাদা-কালো কোট প্যান্ট জুতসই। শ্মশ্রু-গুম্ফ রাবীন্দ্রিক কায়দায় নীচে নেমে এসেছে। কোটের কালো ভেদ করে শার্টের শাদা। মাথায় উঁচু টপ হ্যাট। পায়ে পার্শ্ব ফিতেওয়ালা পাম্প শ্যু। সময়কাল গুলিয়ে যায়। ইহুদীদের সাপ্তাহিক ধর্মাচরণ সাবাথ। মেয়েদের সাবাথের সময় শাদা গাউন, অন্য সময় লম্বা শরীর ঢাকা পোশাক, মাথায় টিচেল নামক হেডস্কারফ। ইহুদী মেয়েদের কথা বললাম। তাদের দিকেই চোখ যায় সব থেকে বেশী।  ক্রিশ্চানদের পোশাক বিশ্বায়িত। ও আরবেরাও আছে অনেক। শুক্র-শনিবারের সাবাথের আগে ইহুদীরা ব্যাগ ভর্তি করে বাজার করে থাকে। সাবাথের সময় ট্রান্সপোর্ট কম। আমরা বাজারের জায়গা গুলোতে যেতাম সস্তায় খাবারের সন্ধানে। জায়গাগুলো মায়াবী। ইউহুদা মার্কেট এরকম এক স্থান।
ইউহুদা মার্কেট
ফলমূল, অলিভ অয়েল, চকচক করতে থাকা ড্রাই ফ্রুটসে সজ্জিত। পরপর দোকান, খুব চড়া দাম, সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্রও বটে। ওইখানে কোন দোকানে বসে চা খেলেও নিজেকে ইতিহাসের অঙ্গ মনে হবে। প্রথম দিনের অনভিজ্ঞতার গচ্চা হিসেবে “সাজুকা” নামে প্রচুর দাম দিয়ে এক ইসরায়েলি খাবার ও ইসরায়েলি মদ “আরাক” খাওয়া হল। আরাকের মৌরির মত টেস্ট, কালারলেস, শটে খায় ও জলে দিলে শাদা সলিউশন। হিব্রু ইউনিভার্সিটির এক ইহুদী মেয়ে  এই আরাকের কথা বলেছিল। তার চোখের দিকে তাকালে দু'হাজার বছর পর্যন্ত পিছনে দেখতে পাওয়া যেত।
আরাকের দোকানে


রাস্তায় কোট-প্যান্টে অর্থোডক্স ইহুদীরা
হোটেলে আমাদের ব্রেকফাস্ট ফ্রি। সুবিশাল হলে বুফে সিস্টেমে যত খুশী তত খাও। নানা দেশের খাবারের সমাহার। লাঞ্চ ইউনিভার্সিটি দিত। রাতের খাবার নিজেদের জোগাড় করতে হত।  হেঁটে হেঁটে বা ইলেকট্রিক কার-এ করে আমরা সেইসকল স্থানে পৌঁছে যেতাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইজরায়েলিনী তার আঙ্গিকে আমাদের নেশাতুর করে ফেলেছিল। রাতের দিকে যখন ঘুরতাম, অনেক কিছুই চোখে পড়ত। রাস্তায় দেখা হলে ভারতীয় বুঝতে পেরে অনেকে আমাদের “নমস্তে” সম্বোধন করত। আমরা দেখলাম ইহুদীদের খাবার “ফালাফেল”-ই সুস্বাদু আর আমাদের পকেটের পক্ষে উপযুক্ত। একধরণের ভাজা বড়া তিলের পেস্ট বা হামাসে পুরে পিটা ব্রেড নামক রুটিতে জড়িয়ে দ্যায়। সাথে আরও কিছু শেকেল খরচ করলে একটা বিয়ার। বিয়ার আমি-ই খেতাম, অভিনন্দন’দা বা আই.আই.টি-র অনির্বাণ ড্রিঙ্ক করে নি।
মেক্সিকান বিয়ার "করোনা" খাইয়েছিল ইউনিভার্সিটিতে। একদিন রাস্তায় একজনের সাথে দেখা, আচরণে বোঝা গেল ভেড়ুয়া। এনি ডে তাকে সেখানে পাওয়া যাবে। সস্তায় বিয়ারের লোভ দেখাল। ইঙ্গিতবহ, রহিসের মন পাওয়ার মত আচরণ। আমরা কোনক্রমে পাশ কাটাচ্ছি এই বলে যে আবার পরে দেখা হবে, তখন সে পেছন থেকে বলে ওঠে “লঙ লাইফ......”।


আমাদের এখানে ওয়ার্কশপে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা রয়েছে। রাশিয়া, সুইজারল্যান্ড, আরমেনিয়া, জার্মানি, কোস্টা রিকা, আমেরিকা তো বটেই, ইটালি, হল্যান্ড, চীন, জাপান, কোরিয়া, ইত্যাদি। সত্যি-ই  রোমাঞ্চকর। ইউনিভার্সিটির তরফ থেকে প্রথম যে ট্রিপ অরগানাইস করা হয়, তা হল জেরুসালেমের ওল্ড সিটি। সকলে মিলে বাসে করে বেরিয়ে পরলাম।


দেওয়ালের ওইপারে ওল্ড জেরুসালেম
পুরনো শহরটা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পায় ১৯৮১ সালে। সেই ইতিহাসখচিত টেম্পেল মাউন্ট! আমরা স্তব্ধ হয়ে যাই। বাস কিছুক্ষণ চড়াইতে থাকলে বুঝলাম এইটাই জেরুসালেমের সবচাইতে উঁচু স্থান। বাস থেকে নেমে যেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম সেখানে জেরুসালেমের সুবিশাল তোরণদ্বার। তাতে খচিত সহস্রাব্দের কামানাঘাত। দেওয়ালের ওপর থেকে নীচে আক্রমণকারী শত্রুর মাথায়  গরম তেল ফেলার আয়োজনবিশেষ। সর্বত্র যুদ্ধবিধ্বস্ততার লক্ষণ। ওই বুঝি ওইখান থেকে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে ক্রুসেডারদের চিৎকার। শহরের স্কাইলাইনটা বিভিন্ন সময়ের স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন রাখছে। আরবদের, ক্রুসেডারদের ও টেমপ্লারদের একেকরকমের স্থাপত্য।  চ্যাপেলের ত্রিকোণ এদিক ওদিক থেকে স্পষ্ট হচ্ছে। কোথাও বা মসজিদের মত ডোম। জেরুসালেম ইহুদী, ক্রিশ্চান ও মুসলমান তিন ধর্মের জন্যই খুব পবিত্র।  শহরে ঢুকবার আগে তিন ধর্ম মিলিয়ে এই শহরের মারাত্মক গুরুত্বের জায়গাগুলোর ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিই  চলুন।
কামানাঘাতে বিধ্বস্ত তোরণদ্বার


১। পুরো টেম্পেল মাউন্ট-ই এক পবিত্র স্থান।


২। ওয়েস্টার্ন ওয়াল বা ওয়েলিং ওয়াল, যা এই মুহূর্তে ইহুদীদের প্রার্থনা করার পবিত্রতম জায়গা।  এর পিছনে যে জায়গাটা সেটা আসলে আরও পবিত্র, কিন্তু সেটা সৃষ্টির শুরুর সময়কার স্মৃতি বহন করে ইহুদী ধর্মগ্রন্থ তাল্মুদ বা তোরাহ মতে, তাই সেখানে পদার্পণ করা ধর্মপ্রাণ ইহুদীর কাছে ব্লাসফেমি।


৩। আল-আকসা মসজিদ, সুন্নী মুসলমান মতে যেখান থেকে মহম্মদ স্বর্গারোহণ করে ছিলেন।


৪। সোনায় মোড়ানো ‘ডোম অফ দ্য রক’, যার ভেতর সুরক্ষিত ‘ফাউন্ডেশন স্টোন’, ইহুদী ও ইসলাম মতে যা সৃষ্টির আদিশিলা, আর বাইবেল(ওল্ড টেস্টামেন্ট) মতে এখানেই আব্রাহাম ঈশ্বরের কথানুযায়ী তার পুত্র আইজ্যাক-কে বলি দিতে উদ্যত হন।


৫। ‘চার্চ অফ হোলি সেপাল্কার’, খৃষ্টীয় মতে যা যীশুর ক্রুশিফিকশন ও রেসারেক্সানের স্থান।
ওল্ড জেরুসালেমের রাস্তাঘাট



সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে কি প্রকার ধর্মীয় রাজনীতি ও তার হাত ধরে জিও-পলিটিক্সের মোহনা হবে এই জেরুসালেম শহর। উল্লেখযোগ্য, জেরুসালেমের আরেক নাম Zion. ইসরায়েল ইহুদীদের "প্রমিসড ল্যান্ড", স্বয়ং ঈশ্বর আব্রাহাম কে এই জমিটুকু "চিলড্রেন অফ ইসরায়েল"-এর জন্য দিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গড়ে তোলার আগে দু হাজার বছর ধরে ইহুদীদের কোন নিজস্ব রাস্ট্র ছিল না। ইতিহাস বলে দু’ হাজার বছর আগে রোমানরা ইহুদীদের জেরুসালেম থেকে উৎখাত করে ও তাদের ঐতিহাসিক ও এখানে অবস্থিত দ্বিতীয় টেম্পেলটা ধ্বংস করে। সেই যে বহির্গমন (এক্সোডাস বা ডায়াস্পোরা) ঘটে ইহুদীদের আর তারা দু'হাজার বছরের মধ্যে ইসরায়েলে ফিরে আসতে পারেনি। সেই দ্বিতীয় টেম্পেলটার ধ্বংসাবশেষ এখনকার ওয়েলিং ওয়াল। ইহুদীদের সেই থেকে নিজেদের কোনও টেম্পেলও নেই। যে সিনাগগে তারা প্রার্থনা করে তা মূলত রিডিং রুম বা ধর্মীয় আলোচনা কক্ষ। এই ঘটনারও কয়েক'শো বছর আগে জ্যু'দের প্রথম টেম্পেলটা ধ্বংস করেছিল ব্যাবিলনিয়ানরা।  তখন জ্যু'দের বন্দী করে ব্যাবিলনে নিয়ে যাওয়া হলে তারা নীলনদের তীরে বসে জেরুসালেমের কথা মনে করত আর  চোখের জল ফেলত [এখানে শুরুর কোট'টা দ্রষ্টব্য]। এবার উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক। আবার জেরুসালেমে প্রত্যাবর্তন করুক সমগ্র পৃথিবীর ইহুদীরা, এই দাবি ওঠে আর মুভমেন্টটার নাম হয় Zionism. হলোকাস্টের পর দাবিটা মোটের উপর সর্বাত্মক হয়ে ওঠে। ১৯৪৮ সালে হলোকাস্ট পরবর্তী জীবিত ইহুদীরা সারা পৃথিবী থেকে এসে ইসরায়েল স্টেট গঠন করে। যেহেতু ইসরায়েল রাস্ট্রের জন্মই এ'ভাবে তাই যুদ্ধ যে সেখানে একটা নিত্ত-নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে উঠবে পরবর্তীতে সে তো অনুমান করা যেতেই পারে। নেসেন্ট ইসরায়েলের ওপর প্রতিবেশী আরব দেশেরা আক্রমণ শানায়। এখন ইসরায়েল তাদের পূর্বের ইন্সিকুরিটি বশত বোমাবর্ষণ করে  গাজা স্ট্রিপ আর প্যালেস্তাইনের উপর। ঠিক যেভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভারসাই ট্রিটি নাৎসি জার্মানি তৈরি করেছিল, হলোকাস্ট তৈরি করেছে সাম্রাজ্যবাদী ইসরায়েল কে। আর মূলত ১৯৪৮ এ উৎখাত হওয়া আরব ও ক্রিশ্চানরা যে জায়গাটায় থাকতে শুরু করে তাই প্যালেস্তাইন বা ঐতিহাসিক ফিলিস্তাইন স্টেটস। মাঝে মধ্যেই ইসরায়েল প্যালেস্তাইনের কোন নতুন একটা জায়গা নিজেদের দখলে আনতে চায়। প্রাণ যায় নিরপরাধ সুন্নী মুসলমান ও ক্রিশ্চানদের। অবশ্য ইহুদীদের এই আচরণের পেছনে যত না তাদের আগেকার বিপন্নতা তার থেকেও বেশী আমেরিকার মন্থরা সুলভ আচরণ, কারণ আমেরিকার জিও-পলিটিক্স চিরকালই আরব বিরোধী। ইসরায়েলের সাথে মৈত্রী তৈরি করে পুরো আরব পলিটির চাপ বজায় রাখতে চায় একমেরু বিশ্বের পৃষ্ঠপোষক আমেরিকা। আমেরিকার মদতেই ক্ষণে ক্ষণে যুদ্ধ ধর্ষণের চেহারা নেয় এইসব এলাকায়।


সে যাই হোক, আরবরাও কিন্তু ছেড়ে কথা বলে না। এই ইসরায়েলের মধ্যে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও টেম্পেল মাউন্টের শাসন ক্ষমতা কিন্তু প্রতিবেশী আরব দেশ জর্ডানের হাতে। এমনকি তার ওপরে উঠে প্রার্থনার অধিকারও শুধুমাত্র মুসলমানের। কোনও ইহুদী বা ক্রিশ্চান তার ওপরে উঠলে নজর রাখা হয়ে থাকে যাতে তাদের প্রার্থনার জন্য ঠোঁট না নড়ে। সর্বত্র এক চাপা টেনশান। কে বলবে আব্রাহামের এক ছেলের বংসধররা যদি ইহুদী হয়, তো অন্য এক ছেলে থেকে এসেছে আরবরা।


ওয়েস্ট্রান ওয়াল বা ওয়েলিং ওয়াল
আমরা “ওয়েস্ট্রান ওয়াল” বা “ওয়েলিং ওয়াল”-এ হাত রেখে প্রার্থনা করলাম। ক্রুসেডের দিনগুলোয় যখন ইহুদীদের জেরুসালেমে প্রবেশ বারণ তখন একটা দিন বছরের তাদের আসতে দেওয়া হত। তখন তারা এই দেওয়ালে হাত রেখে কাঁদত আর তাদের জাতির অতীত গৌরবের দিনগুলি স্মরণ করত। সেই থেকে ক্রিশ্চানরা "ওয়েস্ট্রান ওয়াল"-কে মক করে বলে "ওয়েলিং ওয়াল"।  প্রার্থনা করে পশ্চাদপসরণে ফিরে আসতে হয়। ওয়ালের দিকে পিছন করতে নেই।


আমরা ভেসে চলেছিলাম। স্বপ্নেও কখনো ভাবি নি কোনোদিন ওয়েস্ট্রান ওয়াল ও মুসলমান মতে সৃষ্টির যে আদিশীলা তা যেই সোনায় মোড়ানো “ডোম অফ দ্য রক”-এ সুরক্ষিত সেই সব  ক্যামেরার একটা ফ্রেমে বন্দী করে ফেলতে পারব।
সোনায় মোড়ানো "ডোম অফ দ্য রক", তার পাশে ওয়েস্ট্রান ওয়াল

ওয়ালে হাত রেখে প্রার্থনা করছেন ইহুদীরা
                                                  ওয়েস্ট্রান ওয়ালের সামনে যে প্রশস্ত চত্বর তা ওয়েস্ট্রান ওয়াল প্লাজা নামে খ্যাত (ছবি দেখুন)। ওয়ালের পার্শ্ববর্তী একটা সিনাগগ। সেই সিনাগগে ধর্মপ্রাণ ইহুদীরা তাদের মেসিয়ার আসার অপেক্ষা করছে। তিনি এলে তাঁর তত্ত্বাবধানে শুরু হবে “থার্ড টেম্পেল” গড়ার কাজ। এই মেসিয়ার আসার প্রফেসিটা অনেকটা বজ্রযান বৌদ্ধ ধর্মে  মৈত্রেয়ী বুদ্ধ আসার প্রফেসির মত। ইহুদীদের একটা অর্থোডক্স গোষ্ঠী এর উপর ভিত্তি করে এমনকি ইসরায়েল রাস্ট্রেরও বিরোধিতা করে। তাদের দাবী একমাত্র মেসিয়ার তত্ত্বাবধানেই ইসরায়েলে ফেরা উচিত ছিল ইহুদীদের কারণ তখনই একমাত্র আবার তৈরি করা সম্ভব হবে থার্ড টেম্পেল। তারা প্যালেস্তাইনের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনেরও বিরোধিতা করে। এই গোষ্ঠীটার নাম চারেদী বা হারেদী।



আমরা যখন ওয়েস্ট্রান ওয়াল প্লাজায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ কানে এল এক উত্তুঙ্গ ইহুদী সুরারোপ ও কিছুক্ষণ অভিনিবেশের পর বুঝলাম একটা টাওয়ারের ছাদে এক ইহুদী বিবাহানুষ্ঠান চলছে। কি গায়ে কাঁটা দেওয়া সুর! দেখতে পাচ্ছি গ্রুম কে খাটি ইহুদী পোশাকে, ব্রাইড কে ঈশ্বরী কে লজ্জা দেওয়ার মত  সৌন্দর্যে ও লম্বা শাদা গাউনে, উপস্থিত সভ্যগণ কে মাথায় ইয়ামাকা(ফেজ টুপি)-তে। মেলো ও গম্ভীর পুরুষকন্ঠ। মহৎ ও নাটকীয়ও বটে।  গানটা তার পরম ক্লাইম্যাক্সে এসে শেষ হলে সভ্যদের সহর্ষ ও তুমুল হাততালি ও চিৎকার বলয়িত হতে হতে ছড়িয়ে পড়ে গোটা জেরুসালেম শহরে।


হোলি সেপাল্কারে ঢুকতে; টাওয়ার অ্যান্ড ট্রী
ওল্ড জেরুসালেম শহরটার মূলত চারটা ভাগ- আরমেনিয়ান, ক্রিশ্চান, ইহুদী ও মুসলমান। ক্রিশ্চান ভাগটা আবার নিয়ে রেখেছে চার্চের বিভিন্ন ডিনোমিনেশান গুলো, যেমন রোমান ক্যাথোলিক, গ্রিক অর্থোডক্স, রাশিয়ান অর্থোডক্স ইত্যাদি। যা বুঝলাম তাতে মোটের ওপর এই ডিনমিনেসান গুলোর ভেতরে সাপে-নেউলে সম্পর্ক। রাশিয়ান অর্থোডক্স মহিলারা যারা প্রার্থনা করতে এসেছেন দেখে মনে হবে বুঝি মুসলমান, কালো বোরখায়। আমাদের মধ্যে এক আরমেনিয়ান মেয়ে ছিল, সে আরমেনিয়ান কোয়ার্টারে গিয়ে বেশ উত্তেজিত হল। প্রতিটি কোয়ার্টারে হালকা বদলে যাচ্ছে স্থাপত্যশৈলী। লম্বা, স্টাইলিশ ও ঘন গাছ গুলো শহরটা কে আরও ঐতিহাসিক আর সুন্দর করেছে।
সূর্য এসে গলে যাচ্ছে জেরুসালেমের দেওয়ালে দেওয়ালে।   পুষ্পের গন্ধ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নতুনতর যৌনতায়। আমাদের স্নায়ুতন্ত্রীও শিখছে নতুন এই আনন্দের ব্যাকরণ।  মোটের ওপর জেরুসালেম স্টোন ও কিছু জায়গায় অন্যান্য পাথর ব্যবহার হয়েছে স্থাপত্যে। ইহুদী কোয়ার্টারে অর্থোডক্স ইহুদীদের থাকার ব্যাবস্থা দেখলাম। সেই সব বাড়ি-ঘর-দোরের ভেতর কোনোদিন কোনো ভোগ্যসামগ্রী প্রবেশ করতে পারে নি।
                                              অবশ্য জেরুসালেম বললে প্রথমে মনে আসে ক্রুসেড। ইতিহাসের সেই সর্ববৃহৎ খুনোখুনি ধর্মের নামে। সুলেমানের অধিকৃত জেরুসালেম। রক্তপাত, রক্তপাত। হাসপাতাল, হাসপাতাল। গাইড বলল এইসব হাসপাতালে যুগের তুলনায় উন্নততর চিকিৎসার ব্যাবস্থা থাকা সত্ত্বেও ক্রুসেডের সময় দিনে শ’দুয়েক করে লোক মারা যেত। হায় ধর্ম!


আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে একটু পর সকলে আরব বাজারের দিকে চলে যাবে। সেখানে বিজাতীয় ঘ্রাণ। মশলার ও মাংসের। জমজমাট। তখন রামাদান’ও বটে। পরিশ্রমী মুসলমান ব্যাবসায়ী'দের আসর।
কিউবিকল গুলো তে ক্রুসেডের সময়ে বাজার বসত
                                           আমি হঠাৎ কি একটা যেন আওয়াজ পেলাম। কে যেন ডাকল। গিয়ে দেখি কয়েকটি স্তম্ভের নীচে একটি বাজার বসেছে। একজন দোকানদার বিজাতীয় কোনও ভাষায়, আরবি বা হিব্রুতে, আমাকে ডেকে কি বলছে। লোকটার মাথায় টুপি পরনে শাদা জোব্বা। দিয়ে একটা কি জিনিস আমার হাতে এমনভাবে ধরিয়ে দিল, যেন টাকা দিয়েও কিছু নিতে ভুলে গেছি। বেশ। হঠাৎ পাশে আমাদের অন্য গ্রুপটির গাইডকে দেখলাম। সে বোঝাচ্ছে (সামনে ফাঁকা জায়গাটা দেখিয়ে) যে ওইখানে ক্রুসেডের সময়ে বাজার বসত।
এখন পরিত্যাক্ত। আমি সম্বিত ফিরে পাই। আমার দলটা তখন অনেকটা এগিয়ে গেছে। যে লোকটা কে আমার সাথে কথা বলতে দেখেছিলাম তাকে দেখি কিছু দূরে সাধারণ পোশাকে দাঁড়িয়ে। তবে আমার হাতে কিছু ধরা নেই। বাজারের জায়গাটাও ফাঁকা। প্রশস্ত জায়গাটাতে চার-পাঁচটা থাম। যার নীচে কিছুক্ষণ আগে বাজার বসতে দেখলাম। এক প্রগাঢ় বিষণ্ণতা  আমায় গ্রাস করে।  তবে এইসব নিয়ে পরে বিশেষ ভাবি নি, তা কেন জানি মনে হয়েছিল অস্বাস্থ্যকর।



“ডোম অফ দ্যা রক” যাকে বলা হয়ে থাকে তাকে দশ বছর ছাড়া ছাড়া ধনী শেখরা সোনায় মুড়ে দ্যান, আবার খুলে ফেলেন। ওর ভেতর আরবী মুসলমান ছাড়া কারো প্রবেশ কঠিন। আমাদের ভেতরেও তো ক্রিশ্চান-ই বেশি, সুতরাং আমাদেরকেও বাইরে থেকেই দেখতে হল। ওর ভেতরেই সংরক্ষিত রয়েছে “ফাউন্ডেশন স্টোন”, সৃষ্টির আদিশীলা।


মোমবাতির আলোয়, হোলি সেপাল্কারের ভেতর
“চার্চ অফ দ্য হোলি সেপাল্কার”-এর ভেতরে অবশ্য ঢুকলাম। যীশুর যে ক্রুসিফিকশনের সাইটটা বলা হচ্ছে তা গির্জার ভেতরে একটা মন্দিরের মত আকৃতির অন্দরে। মাথা নীচু করে ঢুকতে হয়। ভেতরে  দেখলাম মাতা মেরী ও যীশুর ফটো। স্বল্পায়তন জায়গাটায় ক্যান্ডেলের আলো। ঘন্টার আওয়াজ। তবে এখানেই ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন পশ্চিমী সিদ্ধাই খ্রীষ্ঠ! আঃ, স্বাদ মিটল। ছোটবেলায় দেখা গুড ফ্রাইডে-র দিন যীশু টেনে আনছেন ক্রস, স্মৃতিতে এখনো তাজা।  ওই নির্দিষ্ট জায়গাটার ভেতরে যেন একটি তান্ত্রিক সাধনার আবহ লক্ষ্য করছিলাম। কোথায় যেন শুনেছিলাম, যীশু ছিলেন বৌদ্ধ তান্ত্রিক নাগার্জুনের শিষ্য। এইখানে আশেপাশে আমাদের হিন্দু মন্দিরের মত ডোর বা তাবিজ বেঁধে দিচ্ছেও দেখলাম। আমরা ফিরে আসার পর পরই এই চার্চটিতে রেনোভেশানের কাজ আরম্ভ হয়।



আমাদের গাইড সব কিছু বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। শহরের ভেতর কিছু টানেল বা সুড়ঙ্গ রয়েছে, কিন্তু বেলা পড়ে যাওয়ায় ওই গুলোতে আর কর্তৃপক্ষ আমাদের প্রবেশ করতে দিলেন না। আমি মনে ভাবছিলাম ইসরায়েল ইহুদীদের প্রমিসড ল্যান্ড, যীশুরও কর্মকাণ্ড জেরুসালেম ও বেথলেহেমে, এমনকি মহম্মদও মক্কা-মেদিনার আগে জেরুসালেম কেই নিজের রাজধানী করতে আগ্রহী ছিলেন। কি আকর্ষণ, যার ফলে সেই তিন হাজার বছর আগে আব্রাহাম এখানে আসার পর থেকে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে তিন সহস্রাব্দ ব্যাপী নিজেকে তুলে ধরেছে! আব্রাহাম ছিলেন মেসপটেমিয়ার এক আইডোলেটার পরিবারের ব্যাক্তি ও প্রথম মনোথিস্ট যিনি ইসরায়েলে এসে এখানকার কিছু জমি কিনে নেন। তার নামেই ইহুদী, ক্রিশ্চান ও মুসলমান এই তিনটে ধর্মকে বলা হয় "আব্রাহামানিক রিলিজিয়ান"। আইজ্যাক ও ইসমায়েল তার সন্তান। আইজ্যাক থেকে এসেছে ইহুদীরা ও ইসমায়েল থেকে এসেছে মুসলমানরা।

                                               কিছু ফ্রিজ ম্যাগনেট কিনে নিলাম সুভিনিয়ার হিসেবে। আরব মার্কেটে খুব সস্তায় অনিওন ও চিজ ফ্লেভারড ফালাফেল ভাজা হচ্ছিল তাও কিনলাম।   জেরুসালেম শহরে ঢুকেই ক্রিশ্চান কোয়ার্টারে এক মহিলার হৃদয়বিদারী কান্নার আওয়াজ শুনেছিলাম।  কনফেশান হয়তো বা। এখানে এ'সবের রেওয়াজ আছে। শহর ছাড়তে ছাড়তে ওই শব্দটাই যেন কানে অনাহত শব্দের মত লেগে রইল, ইতিহাসের অবরুদ্ধ কান্নার প্রতীক স্বরূপ।


                                                                বেথলেহেম


 যীশুর মৃত্যুস্থান তো  হল,  জন্মস্থান-ই বা বাদ যাবে কেন! যদিও আমাদের ইউনিভার্সিটি থেকে যে ট্রিপ আরেঞ্জ করা হয়েছিল, তাতে বেথলেহেম ছিল না, প্যালেস্তাইনে অবস্থিত হওয়ার কারণেই নিশ্চয়। সুতরাং আমরা ২০০ শেকেল খরচ করব মনস্থ করলাম। আমাদের দলে আমি, অভিনন্দন’দা, একটা নাক উঁচু জার্মান, এক নীলাঞ্জনা জার্মান সুন্দরী, একটা আমেরিকান ও একটা মেক্সিকান মেয়ে। নাক উঁচু জার্মানটা সর্বদা ব্যাক্তিত্ব খাটাবার চেষ্টা করছিল, যেমন জার্মানরা করে থাকে আর কি। প্যালেস্তাইনে ঢুকছি বলে কোন ভিসার ব্যাপার নেই, শুধু মাঝখানে একবার গাড়ি বদল করে নিতে হবে। বেথলেহেমে চারটি মূল আকর্ষণ ছিলঃ


১। শেফারড’স ফিল্ড ও তার পার্শ্ববর্তী গুহাগুলো, যেখানে দু'হাজার বছর আগে যীশুর সমস্ত কীর্তি হয়েছিল।


 ২। যীশুর জন্মস্থান বা চার্চ অফ নেটিভিটি।


৩। ইসরায়েল-প্যালেস্তাইনের সেই বিখ্যাত দেওয়াল যেখানে অঙ্কিত বিভিন্ন গ্রাফিতি, যার মধ্যে চিত্রকর ব্যান্সকি-র গ্রাফিতিও আছে।


৪। বেথলেহেমের সর্বত্র দেওয়ালে দেওয়ালে অঙ্কিত ব্যান্সকির গ্রাফিতিগুচ্ছ।


গুহার ভেতরে
আমাদের গাইড সুন্নী মুসলমান, স্যাম। প্রাঞ্জল ভাষায় বুঝিয়ে দিচ্ছিল বিবলিকাল ঘটনাবলী। শেফারড’স ফিল্ড সেই জায়গা যেখানে ইতিহাসপ্রশিদ্ধ মেষপালক যীশু বিচরণ করেছিলেন। মূলত যে জাতি ইউরাল পর্বতমালা থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল তাই তো ভারতে আর্য, তাদের দেখেছিলাম কাশ্মীর ভ্রমণকালে সিন্ধুনদের তীরে, এখন তাদের জাতভাইদের দেখছি, বলা ভালো ভিসুয়ালাইস করছি, ভেড়া চরাচ্ছে। লম্বা জোব্বা। মাথায় কোঁকড়ানো চুল। জানিয়ে রাখা ভালো যীশু ছিলেন একজন ইহুদী। তার মৃত্যুর পর তার অনুগামীরা আলাদা ধর্ম স্থাপন করে। ওই তো ওই ভিড়ে যীশু কেও দেখা যাচ্ছে না? সেই প্রবাদপুরুষ যার ডাকে মৃতদেহও উঠে বসত? পার্শ্ববর্তী গুহাগুলো তে গেলাম। এইখানেই কি প্রিচ করতেন তিনি? এরকমই এক গুহার ভেতরে একটা চার্চ।
তার ভেতরে বসে ধর্মকথা শোনাল স্যাম। নাক উঁচু জার্মান এইখানে বাগড়া দিচ্ছিল নাস্তিকতার দোহাই দিয়ে। প্রাচীন গুহাগুলো কে রেনোভেট করে ট্যুরিসমের উপযুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এরকম তিনটে গুহাতে আমরা গেলাম। গুহার বাইরে প্রশস্ত চত্ত্বরে মার্বেলের স্থাপত্যশৈলী। মার্বেলের ভেড়ারূপী ফাউন্টেনের মুখ থেকে নির্মল জল গড়িয়ে পড়ছে বেথলেহেম-বেথলেহেম শব্দে। জলের ওপর সূর্যালোক প্রতিফলিত হয়ে চমৎকার অদ্বৈত হয়ে রয়েছে। মাঝখানে যীশুর প্রকাণ্ড শ্বেত-শুভ্র, সৌম্য মূর্তি। মানুষের মনে এক ধর্মীয় আলোচনার নিগড়। মা কে পুরো ঘটনা ফোনে বলাতে সে কি রোমাঞ্চ বাড়ির লোকের। মা বলল, “দক্ষিনেশ্বরে গিয়ে যেমন মনে হয় এইখানে রামকৃষ্ণ হেঁটে চলে বেড়িয়েছেন, তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে সেইখানে সেরম যীশুও হেঁটেছেন, চলেছেন...”।


হ্যাঁ, আর জন্মিয়েছেনও বটে! চার্চ অফ নেটিভিটি। প্রবেশদ্বারটা এতো নীচু যে মাথা অনেকটা ঝুঁকিয়ে ঢুকতে হয়। এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, হিউমিলিটির শিক্ষা! জেরুসালেমের ক্রিশ্চান কোয়ার্টারের মত এ'খানেও চার্চের অনেক ডিনোমিনেশন উপস্থিত। রোমান ক্যাথোলিক, গ্রিক অর্থোডক্স, ইজিপশিয়ান ইত্যাদি। মধ্যযুগে এই চার্চটা অনেকটা সময় দখল করে রেখেছিল ব্যাইজান্টাইনরা। তাদের করা বিখ্যাত মোজাইক দেখলাম। পরে মাসাডায় রোমানদের মোজাইক দেখেছিলাম। দু'টোই চমৎকার। জটিল ও শিল্পময় তাদের কারুকার্য।  চার্চটাতে এক জায়গায় দেওয়ালের গায়ে পাঁচ আঙুল প্রবেশ করে প্রার্থনা করার জায়গা আছে। আমরা তা করলাম, ও জার্মান বাগড়া দিল। এরপর প্রিস্টিন মার্বেল পাথরে সজ্জিত চার্চটা তে আমরা ঘুরতে থাকি। ইন্দ্রপ্রস্থে পাণ্ডবদের যে প্রাসাদ দেখে কৌরবদের ঈর্ষা জন্মিয়েছিল, অনেকটা সেইরূপ। আমরা ঘুরতে ঘুরতে একেবারে পৌঁছে যাই সেই “স্টার” চিহ্নটার কাছে, যার ওপর যীশু ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। লোকে ঘিরে ধরে ছবি তুলছে।
এই সেই স্টার। ভিড়ের চোটে কেঁপে গেছে হাত।
 এই চার্চ অফ নেটিভিটিতে ২০০২ সালে কিছু বন্দুকধারী লোক এসে চার্চের দরজা বন্ধ করে নিজেদেরকে ইসরায়েলি সৈন্যের হাত থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করে। তাদের ইসরায়েলি বাহিনী আগে থেকেই খুঁজছিল। চার্চে যারা এসেছিল অনেকেই নাকি স্বেচ্ছায় ও বাকিরা হোস্টেজ হিসেবে হিউম্যান শিল্ডের কাজ করে। ইসরায়েল বিশেষ গুলিগালা চালায় না বরং খাবার-দাবারের সাপ্লাই বন্ধ করে দেয়। কিছু বন্দুকধারী মারা যায়। তারপর লম্বা নেগশিয়েশানের পর অবশিষ্ট বন্দুকধারীদের অন্য কোন এক দেশে পুনর্বাসন দেওয়া হয়। সেই ঘটনাটা নিয়ে প্যালেস্তাইনের "ফ্রিডম থিয়াটার"  "দ্য সিজ" নামে একটা নাটকও মঞ্চস্থ করে।


বেথলেহেমের সর্বত্র দেওয়ালে দেওয়ালে ব্যান্সকির করা যুদ্ধবিরোধী গ্রাফিতি। সেই বিখ্যাত গ্রাফিতিটা দেখলাম, যেখানে একটা গেরিলা মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্যালেস্তাইন থেকে ইসরায়েলের দিকে ফুলের তোড়া ছুঁড়ে দিচ্ছে। পুরো ছবিটা সাদাকালোয়, ফুলের তোড়াটা রঙিন।
সেই বিখ্যাত গ্রাফিতি
এই ব্যান্সকি একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যাক্তি বা ব্যাক্তিবর্গ। জাতিতে ব্রিটিশ। পৃথিবী জুড়ে এইসব কাজ বিনা পারিশ্রমিকে করে বেরান, অর্থাৎ ঘরের খেয়ে বনের মোষ চড়িয়ে থাকেন। এইভাবে মানুষের বেঁচে থাকা একটু সহজ করে তোলেন, এটাও বলা দরকার।

শেষমেশ ইসরায়েল-প্যালেস্তাইনের সেই বিখ্যাত দেওয়াল। পুরোটায় যুদ্ধবিরোধী গ্রাফিতি-কারটুন-স্লোগান। “ওনলি গড ক্যান জাজ”, “মেক হামাস নট ওয়ালস”, ইত্যাদি।
সেই দেওয়াল
আমরা প্যালেস্তাইনের দিক দিয়ে দেওয়ালটা দেখছিলাম।
কিছু ছবি থাকল সেই সবের।

ওয়ালের পার্শ্ববর্তী একটা দোকান, আশেপাশে আর কিছু নেই। একজন হাস্কি ভয়েসের মধ্যবয়স্কা মহিলা তার ভেতর। গলায় যীশুর লকেট। সেই দোকান থেকে আমরা  টুকিটাকি সুভিনিয়ার কিনলাম, বিশেষ করে অলিভ উডের কিছু কাজ। এই অলিভ উড এ'খানকার বিশেষত্ব। অলিভ উডের এক ছোট যীশু কিনলাম।
হাস্কি ভয়েসের সেই মহিলা
 মহিলা একটা বাড়ি দেখিয়ে বললেন যে সেটা তার বাড়ি। যুদ্ধের সময় তার অবস্থান এমন হয় যে তা না পড়ে ইসরায়েলে না প্যালেস্তাইনে। ফলে তাদের দীর্ঘ সময় গৃহবন্দী থাকতে হয়। তখন তিনি লর্ডের কাছে প্রার্থনা করতেন যে যাতে ওনার পরিবারের সকলে অক্ষত থাকেন, অথবা সকলের মৃত্যু হয়। যুদ্ধকালীন এই প্রার্থনা সার্বজনীন, মনে ভাবছিলাম। আশ্চর্য এই যে সে প্রার্থনা রাষ্ট্রনায়কদের কান অবধি পৌঁছয় না। ওই মহিলার হাস্কি গলার সাথে মিশে যাচ্ছিল বারুদের গন্ধ, নারী শরীরের স্বাভাবিক ডিওড্র্যান্টহীন উগ্রতা। আমি অবাক হচ্ছিলাম মানবিকতার এই ভিন্ন প্রকাশে, ফ্যাসিবাদ যাকে মেরে ফেলতে পারে না।


বেথলেহেম থেকে ফেরার পথে শুধু যুদ্ধের কথাই ভাবছিলাম। জেরুসালেমে “হলোকাস্ট মিউসিয়াম” রয়েছে, যাওয়ার সময় হবে না হয়তো। মূলত আরব জাতি আর ইহুদীদের লড়াইয়ে কত লোকের যে প্রাণ যায়। কেউই কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না। আর সর্বঘটে কাঁঠালি কলা আমেরিকা। যুদ্ধ অবশ্য মনুষ্যত্বের নতুন প্রকাশকেও জাগিয়ে দেয়। তার চিহ্ন তো এইখানে দেখলাম স্পষ্ট। বস্তুত মনুষ্যত্ব হারে না, হার হয় রাষ্ট্রনায়কদের। একটা যুদ্ধ এক হাজারটা ব্যান্সকি তৈরি করে দ্যায়। যুদ্ধের সময় মানুষের মন সমধর্মী হয়ে ওঠে যেহেতু, নতুন মানবিকতার প্রকাশ ঘটে। কনফাইনমেন্ট ও ফিয়ার অফ আইসোলেশান মানুষের ইনহেরেন্ট গুড নেচারকে চাঙ্গা করে, রাষ্ট্রনায়কদের হৃদয়হীনতার বিরুদ্ধে। এও এক "ল অফ অপোসিটস"।


                                                      ডেড সী ও মাসাডা


আমাদের ট্রিপের শেষ রোমাঞ্চ ছিল ডেড সী ও তার পার্শ্ববর্তী মাসাডা ফোর্ট। বাসে করে বেরিয়ে জেরুসালেম থেকে সে নামছি তো নামছি-ই। ডেড সী-র তট হল পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশের সবচেয়ে নীচু স্থান। সমুদ্র তটের চেয়েও ৪০০ মিটার নীচু।  হ্যাঁ, সেই ডেড সী যেখানে মানুষ ডোবে না। এটা প্রকৃতপক্ষে একটা লেক। তার আয়তনের জন্য সী বলা হয়ে থাকে। মানুষ না ডোবার কারণ নুন বেশি হওয়ার ফলে এখানের জলের ঘনত্ব।   আমারাও সেখানে ভেসেছিলাম। অনেকে জলের ওপর শুয়ে খবরের কাগজও পড়েছিল। কি তীব্র নুন সেই জলে, ঠোঁটে লাগলে ঠোঁট পুড়ে যাচ্ছে। আমার চোখে গগলস, নীচে সুইমসুটের জাঙিয়া।
গায়ে-মুখে ডেড সী-র কাদা মেখে জলে ভাসা। ডানদিকে আমি।
মেয়েরা বিকিনিতে। জলের ওপর শুয়ে সাঁতার না জানলেও দিব্যি সাঁতার কেটে এক দিক থেকে আরেক দিকে চলে যাওয়া যায়। এখানে আসতে গিয়ে প্রায় একটা মরুভূমির ভেতর দিয়ে আসতে হয়েছে। শুধু সারি সারি পাম ট্রি চোখে পড়েছে রাস্তায়। গাইড বলেছিল এই ধরণের মরুভূমির নাম রেন শ্যাডো ডেসার্ট। এখানে প্রকৃতি রুক্ষ। লালাভ, খয়েরি ও রোম্যান্টিক পাথরের রং। তার মাঝে ডেড সী-র ঘন নীল সিরিন হয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে অনেকটা লাদাখের লেকগুলোর মত লাগবে।  জলের মধ্যেই ফ্রেশ ওয়াটারের শাওয়ার রয়েছে। মধ্যে মধ্যে গিয়ে সেখানে শাওয়ার নেওয়া যায় যাতে নুনের ফলে গায়ের চ্যাটচ্যাটে ভাবটা কেটে যায়। আমরা মূলত একটা হোটেলের প্রাইভেট বিচে নেমেছিলাম। ড্রেসিং রুমে গিয়ে পোশাক বদলে সুইমিং কস্টিউমে। ছেলেরা জাঙ্গিয়ায়, মেয়েদের ট্যু পিস। তোয়ালে কাঁধে করে একটা ট্রাক্টারের মত গাড়িতে চড়ে বিচে। কি গরম! পৃথিবীর সব দেশ থেকে নারী পুরুষেরা এসেছে। বালি এতো গরম যে হাঁটা যায় না। আমাদের সঙ্গের এক সুইস ছেলে জলে নামল না, সে আমাদের জিনিসপত্র পাহাড়া দিচ্ছিল। ছাতা খাটিয়ে বিদেশিনিরা বিশ্রামরতা।
হরেক দেশের মানুষ
 ডেড সী-র যে কাদা তা মিনেরেলে খুব-ই রীচ। ত্বকের জন্য খুব-ই ভালো। এর থেকে কস্মেটিক তৈরি হয়ে থাকে। ভারতে ইসরায়েল থেকে যে ফারটিলাইসার সাপ্লাই হয় তারও উপাদান এই ডেড সী-র কাদা। প্রথমেই দেখলাম অনেকেরই জলে নামার থেকে এই কাদা মাখার প্রতিই আগ্রহ বেশি। আমরা খুনসুটি করে ছেলেরা মেয়েরা একে অপরের গায়ে তা মাখিয়ে দিচ্ছিলাম। চারিদিকে রাগেড টেরেন ঈষৎ লালাভ ও নয়নাভিরাম, ন্যাশানাল জিওগ্রাফিকে এরম দেখা যায়। দূরে মাসাডা ফোর্ট দেখা যাচ্ছে। ডেড সী-র ওই পাড়টাও দেখা যায়। হয়তো তা জর্ডান। জলে ভাসার সময় একটা সূক্ষ্ম ব্যলান্স ধরে  রাখতে হয়। না পারলে উলটে ঠোঁটে জল লেগে গিয়ে খুব জ্বালা করে। অবশ্য তারপরই সবেগে ভেসে ওঠা। তখন শাওয়ারে গিয়ে নিজেকে ধুয়ে আসা। সী-র ভেতর অবধি চলে গেছে একটা প্ল্যাটফর্ম, তার গায়ে অবধি নুন জমে আছে। আমাদের জলকেলি ক্রীড়ারত গন্ধর্ব ও অপ্সরাদের মত হয়ে ওঠে। লাল দিগন্তে চূর্ণ  নীল জলে স্বর্গের বাসিন্দাদের ক্রীড়া। নেশা বাড়তে থাকে। ছেড়ে যেতে মন চায় না। চীনের মেয়েরা দেখলাম ট্যু পিসের বদলে শরীর ঢাকা পোশাক পড়েছে। বাকি মেয়েরা রংবেরঙের বিকিনিতে। অবশেষে একটা সময় হোটেলে ফিরতেই হয়। স্নান সেরে আমরা হোটেলের পুলে আবার স্নান করলাম, শাওয়ায়ার নিলাম। বিলাশবহুল ব্যাবস্থা। ওই স্নানের পোশাকেই ভেতরে খেতে গেলাম।
হোটেলের সুইমিং পুল। পিছনে দেখা যাচ্ছে ল্যান্ডস্কেপ।
এখানে যারা তখনো চানে যায় নি, এবার যাবে, তারা সাধারণ পোশাকে। আর বাকিরা আমরা চানের পোশাকে। লাল মোরগের ঝুঁটির মত উষ্ণ বিফ স্টিকে কামড় বসাতে বসাতে সামনে দেখছিলাম ব্লন্ড মেয়েটার বিকিনির টপটা সরে গিয়ে ট্যানের আড়ালে নিজের আসল রং ফুটে উঠেছে। সেই দেবদুর্লভ মুহূর্ত!


মাসাডা-র গা বেয়ে উঠছি আমরা, দূরে ডেড সী
এবার  আমরা মাসাডা প্রাসাদে ঘুরতে গেলাম। এটা রোমানদের তৈরি ও এরও নিজের ইতিহাস রয়েছে। মরুভূমির মাঝে এক প্রাসাদ। রোমান রাজা হেরোড দ্য গ্রেটের তৈরি।  গাইড অনেক রোমহর্ষক গল্প শোনালেন। রোমানরা যখন জেরুসালেম দখল করে তখন ইহুদীরা রিভল্ট করে। শেষমেশ তাদের ৯৬০ জন আর তাদের পরিবারেরা বেঁচে ছিল। তারা তখন এই প্রাসাদের চূড়োয় এসে লোকায়। কিন্তু রোমান সৈন্য খবর পেয়ে যায়। তাই ইহুদীরা ঠিক করে মেয়েদের বলাৎকার আর শিশুদের দাসত্ব দেখার থেকে ভালো তারা সপরিবারে আত্মবলিদান দেবে। প্রথমে তারা তাদের সকল নারী ও শিশুকে হত্যা করে। তার পর একে অপরকে মারতে থাকে কারণ ইহুদী মতে আত্মহত্যা মহাপাপ।
শেষমেশ যিনি বেঁচেছিলেন, সেই দুর্ভাগাকেই শুধু আত্মহত্যা করতে হয়। পরদিন রোমানরা এসে দেখে  যে শুধু লাশ যত্রতত্র ছড়িয়ে নিস্তব্ধ পুরীতে। দু'জন মহিলা তাদের পাঁচটা শিশুকে নিয়ে জলের সিস্টারনের পিছনে লুকিয়ে জীবন বাঁচিয়েছিল। তারা জ্যু নেতা এলিয়েজার বেন এয়ারের বক্তৃতাটা নাকি হুবুহু রোমান সৈন্যদের কাছে বলেছিল, এমনই মত রোমানো-জ্যু ইতিহাসবিদ জোসেফাসের---
         
মাসাডায় আমাদের সাথে গাইডের কথা শুনছে নোবেল লরিয়েট ম্যাস্কিন। ডানদিকে।
               "যেহেতু আমরা বহুদিন আগেই প্রতিজ্ঞা করেছি যে রোমানদের দাস হব না, কিংবা অন্য কারো দাস হবো না একমাত্র ঈশ্বর ছাড়া, যিনি একমাত্র প্রকৃত ও সঙ্গত অধিপতি মানুষের, এখন সময় এসেছে সেই প্রতিজ্ঞা কাজে করে দেখানোর,...আমরাই একেবারে শুরুতে বিদ্রোহ করেছিলাম, আর আমরাই ওদের বিরুদ্ধে শেষ অবধি লড়ছি; আর ঈশ্বর আমাদের ওপর যে অনুগ্রহ করেছে তা নিয়ে গর্ব না করে পারছি না, যে এটা এখনো আমাদের ক্ষমতার মধ্যে আছে যে আমরা নির্ভীক ভাবে আর স্বাধীন ভাবে মরব।"

   আমাদের সাথে নোবেল লরিয়েট এরিক ম্যাস্কিনও হাঁ করে গাইডের কথা শুনছিলেন। ইনি কেনেথ অ্যারোর স্টুডেন্ট ও অমর্ত্য সেনের বন্ধু। পাথরের প্রাসাদ বেয়ে আমরা উঠছিলাম। শুরুতে আমাদের একটা লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-তে "সিজ অফ মাসাডা" নামক মুভিটির ক্লিপিং দেখালো। রোমানদের স্নানাগার দেখলাম, যা ছিল মূলত তাদের আলাপ আলোচনার জায়গা। স্নানাগারের মাথাটা বর্তুলাকার, যাতে বাস্প জল হওয়ার পর আশপাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে পারে। গন্ডোলায় চড়ে প্রাসাদের একেবারে উপরে উঠে গেলাম।
গন্ডোলায় চড়ে প্রাসাদের চুড়োয় উঠছি
গন্ডোলা মূলত পাহাড়ের মাঝে অপারেসান রত রোপ-ওয়ে। কাশ্মীরের গুল্মার্গে প্রথম চড়ি। এখানেও পাহাড়ের চূড়োয় উঠতে ব্যবহৃত হল। গাইড সেই দেওয়াল গুলো দেখাচ্ছিলেন প্রাসাদের চারিপাশে  যার ফলে ক্রীতদাসরা পালাতে পারত না। কি অপার্থিব সৌন্দর্য এই শুষ্ক মরুভূমির। দূরে ডেড সী। গাইড ভয় দেখাচ্ছিলেন  এ'খানে ১০০ বছরে একবার ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়, আর গত ৯০ বছর হয়নি। ধ্বংসাবশেষ যেরূপ পাওয়া গিয়েছিল, তার ওপরে সামঞ্জস্য রেখে কিছুটা বানানো হয়েছে, আর অরিজিনাল টুকু কালো কালিতে মার্ক করা আছে। স্টোর রুম গুলোতে নাকি খননের পর দু'হাজার বছরের পুরনো খেজুর পাওয়া গেছিল। কিছু হিব্রু ভাষায় লেখা সিল-ও নাকি পাওয়া যায়। যেহেতু হিব্রু ভাষার প্রায় দু'হাজার বছর কোনও বিবর্তন হয় নি, তাই প্রত্নতাত্ত্বিকরা খননের পর-ই তার পাঠোদ্ধার খুব সহজেই করতে পারে।
প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটে
আকাশ আমাদের শরতের মত নীল ও কিছু মেঘ। মরুভূমির উপর নীলাকাশ দূরে ডেড সী। ভাষায় কি করে বোঝাবো!  মোসাইক এর মধ্যেই জায়গায় জায়গায় মেঝেতে বা দেওয়ালে নয়নাভিরাম হয়ে আছে। এখানকার প্রাচীন সিনাগগটায় বসে শান্তি এল। সিঁড়ির ওপর-ই বসতে হয়। এখানে এই মরুভূমির মধ্যে প্রাসাদটায় জল ধরে রাখার পরিকল্পনাটাও খুব কমপ্লেক্স।
অপার্থিব
এমনি এর গঠনশৈলী যে যতটুকু বৃষ্টি হয় তা নাকি এর ভেতরের সরোবর গুলোতে এসে জমা হয়। তাছাড়াও রোম থেকে খচ্চরে টানা গাড়িতে করে জল এনে স্টোর করার জন্য রয়েছে বড় বড় সিস্টারন। একটা খুব ছোট পাখি, এক জাতির স্টারলিং, তার ডাক বারবার মিশে যাচ্ছিল এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। আমরা কায়ক্লেশে ফোর্টের ওপরে উঠে সেই জায়গাতে দাঁড়িয়েছিলাম যেখানে পাওয়া গেছিল মিউটিনিয়ারদের কঙ্কাল। মরুভূমিতে হঠাৎ করে একটা এরম প্রাসাদ, তাও এরম ইতিহাস, তাও আবার ডেড সী-র নীলের প্রেক্ষাপটে, জায়গাটা সম্বন্ধে একটা গা ছমছম করা ব্যাপার ছিল। রাতে এখানে একা থাকলে কারো কিরম লাগবে কে জানে। ওই জ্যু মিউটিনির ঘটনাটা এখনকার ইহুদীরা বছর বছর উদযাপন করে থাকে। আমরা দেখছিলাম আমরা যে পথে উঠেছি তাছাড়া আরও একটা পথ আছে, তার নাম “স্নেক পাথ”, অনেক বেশী মাত্রায় বিপদসঙ্কুল।
 


 আমাদের ভ্রমণ ভালই হল। ফাঁকে ফাঁকে লেকচার অ্যাটেন্ড করাও চলছিল! ফেরার আগের দিন জেরুসালেম মিউসিক সেন্টারে এরিক ম্যাস্কিনের ক্লেয়ারনয়েট পারফরমেন্স ছিল। তারপর পাশের ব্যাঙ্কোয়েট হলে বিশাল পার্টি। তাতে এলাহি খাবারের সাথে সাথে দু'তিন রকমের ওয়াইন সার্ভ করা হয়।  নোবেল লরিয়েটদের সাথে মদের আসর মায়াবী  ও ক্যরিস্মাটিক হয়ে ওঠে।
শেষদিনের পার্টিতে, ছলকাইয়ে জাম


দেশে ফিরে এসে ম্যাগাজিনের জন্য লেখাটা লিখতে লিখতে বুঝি যত সহজে ঘুরে ফেলেছিলাম দু'টো দেশ, ততই কঠিন  বাঙালি পাঠকের কাছে তা ফুটিয়ে তোলা। সহস্রাব্দের অভিজ্ঞতা সম্পন্না ইজরায়েলিনী ইনস্যাটিয়েবেল, তার প্রতি সুবিচার করা কি সহজ ব্যাপার! তবু যদি কোথাও লেখাটার ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠে সেই  শৃঙ্গার, শ্রম সার্থক। ইতিহাসে লেখা থাক ২০১৬ সালে বাঙালিরা গিয়ে হল্লা করে এসেছিল ইসরায়েলে!


                                     রমণীকেন্দ্রিক সভ্যতা


                                     ভাবনা বেসেছে
                                     অলকানন্দা সমস্ত নদীটা কে বেসেছে


                                     একাসনে বসেছে অনুবাদদক্ষতা ও এপ্রিলের সুকান্ত


                                      বিয়াতার অঙ্গসংবাহনপদ্ধতি তে
                                      মাতৃভূমি অসরাচর হয়ে ওঠে যেন


                                      যেহেতু রজঃস্বলা ইহুদী সে এখন



হ্যাঁ, দেশে ফিরে, বম্বে এয়ারপোর্টে, তখন কপর্দকশূন্য

2 comments:

  1. Darun lekha dada....ami tomak follow kori....ami suryatapa r classmate chilam eksamay
    You are great 👌👌

    ReplyDelete
    Replies
    1. ভালো থেকো। কি নাম তোমার?

      Delete