“রঙ্গভূমি” কিংবা কমল স্বরূপের ফালকেপুরাণ
ধুন্দরাজ গোভিন্দ ফালকে, বা দাদাসাহেব ফালকে (৩০ এপ্রিল ১৮৭০ – ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪), ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ ভারতীয় প্রযোজক-পরিচালক-চিত্রনাট্যকার। ভারতীয় সিনেমার জনক হিসেবেই তাঁর সমধিক পরিচিতি। ভারতের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র, ১৯১৩ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত ছবি ‘রাজা হরিশচন্দ্র’ থেকে শুরু করে, ১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দ অবধি তাঁর ১৯ বছরব্যাপী চলচ্চিত্রজীবনে দাদাসাহেব ফালকে মোট ৯৫টি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি এবং ২৬টি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি বানান। তাঁর সর্বাধিক জনপ্রিয় ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে—মোহিনী ভস্মাসুর (১৯১৩), সত্যবান সাবিত্রী (১৯১৪), লঙ্কা দহন (১৯১৭), শ্রীকৃষ্ণ জন্ম (১৯১৮) এবং কালীয়মর্দন (১৯১৯)। ১৯২০ খ্রীষ্টাব্দে, তাঁর সহযোগীদের সঙ্গে বিবাদের কারণে, তিনি তাঁর সংস্থা হিন্দুস্তান ফিল্মস থেকে পদত্যাগ করে পবিত্র শহর বারাণসীতে চলে আসেন। বারাণসীতে বসে তিনি ‘রঙ্গভূমি’ নামে একটি প্রায়-আত্মজীবনীমূলক নাটক রচনা করেন। এই ছবি সেই নাটকেরই আবাহন-মাত্র।
এইভাবেই শুরু হয় কমল স্বরূপের ‘রঙ্গভূমি’—কালোর ওপর শাদা হরফে লেখা এই কথাগুলি দিয়ে। ও আমরা যদি শুরুর এই প্রস্তাবনাটিকে আক্ষরিক অর্থে সত্য বলে গ্রহণ করি, তবে এই ছবি হয়ে দাঁড়ায় একটি খন্ডসময়ের আখ্যানমাত্র। যেখানে কমল ধরতে চেয়েছেন, সিনেমাজগৎ থেকে স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যাওয়া ভারতীয় সিনেমার পুরোধাপুরুষের মানসিক অবস্থা, বারাণসীতে তাঁর নাট্যসংক্রান্ত কর্মকান্ড, ও সিনেমা তথা নাটকের সঙ্গে তাঁর বিচিত্র সম্পর্কের ইতিবৃত্ত। কিন্তু, শুধুমাত্র এইটুকু সারসংক্ষপের মধ্যে ‘রঙ্গভূমি’র মতো বহুস্তরীয় ছবিকে ধরতে গেলে হয়তো বা মারাত্মক ভুল হয়ে যাবে কোথাও। হয়তো বানচাল হয়ে যাবে কমল স্বরূপের আসল উদ্দেশ্যটাই। কিংবা, দর্শক হিসেবে, সিনেমার মাঝপথেই আপনাকে উঠে যেতে হবে—তিতিবিরক্ত হয়ে।

‘রঙ্গভূমি’কে শুধুমাত্র প্রামাণ্য জীবনীচিত্র, বা একটি নিবিড় গবেষণামূলক কাজ হিসেবে দ্যাখার সমস্যা এই যে, তা কদাচ ধ্রুপদী পাণ্ডিত্যের পথে পা বাড়ায় না—নির্ভর করে না শিক্ষায়তনিক জ্ঞান কিংবা লেখ্যাগারে সংরক্ষিত তথ্য, নথি বা ফুটেজের ওপর। বরং জনশ্রুতি ও লোকপরম্পরার দিকে তার তীব্র আকর্ষণ লক্ষ করি। ফালকের জীবনের প্রায় অনালোচিত একটি দিককে পুনরাবিষ্কার করতে গিয়ে কমল কোনো ইতিহাসবেত্তা বা সিনেমাপন্ডিতের শরণাপন্ন হননি। বরং তাঁকে আমরা ঘুরে বেড়াতে দেখি বারাণসীর অলি-গলিতে, কথা বলতে দেখি মহল্লার সাধারণ মানুষের সঙ্গে। যদিও, এই সব সাক্ষাৎকার থেকে কোনো বিস্ফোরক সত্য উদ্ঘাটিত হয় না। এমনকী, দাদাসাহেব ফালকে সম্বন্ধে কোনো নির্দিষ্ট তথ্যও এতে পাওয়া যায় না বললেই চলে। কেবলই তথ্যের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে এই ছবি। তথাপি, স্মৃতি ও তার সংরক্ষণের একটি নিতান্ত লৌকিক ও দেশজ প্রক্রিয়ার সাথে আমাদের পরিচয় ঘটতে থাকে। বুঝি, কীভাবে সাধারণ যৌথস্মৃতির ভাঁড়ারে মিলেমিশে যায় অসংখ্য অবান্তর ছবি, টুকরো ঘটনার বিবরণ, পুরাণ ও ইতিহাসের সংশ্লেষ। পাশ্চাত্য রীতি-পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে জ্ঞান সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের এই অসরলরৈখিক ও একান্ত ভারতীয় কৌশলটিকে দর্শকের সামনে নিয়ে আসা 'রঙ্গভূমি'র অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মনে হতে থাকে আমার। সময় থেকে সময়ান্তরে, বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে এই ছবির অবাধ যাতায়াত আমাদের বিভ্রান্ত করে, যেমন বিভ্রান্ত করে ভারতবর্ষের মহত্তম পুরাণ ও মহাকাব্যগুলি। ছবিটির মাঝামাঝি, লক্ষ করি, ফালকের সন্ধান থেকে বিচ্যূত হয়ে কখন যেন কমল ও তাঁর সঙ্গীসাথীরা খুঁজতে শুরু করেছেন নারায়ণ হরি আপ্তে (ইনি বারাণসীতে ফালকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন বলে শোনা যায়) নামক এক বিস্মৃত মারাঠি লেখকের ঠিকানা। ও সেই সূত্র ধরে, তাঁরা পৌঁছে যান এক অশীতিপর প্রবাসী মহারাষ্ট্রীয়ের কাছে। বৃদ্ধ জানান, তাঁর সংগ্রহে ছিলো ১৯২০ সাল নাগাদ প্রকাশিত নানান পত্রপত্রিকা, যাতে নারায়ণ হরি আপ্তের (না কি হরি নারায়ণ আপ্তের?) লেখাপত্র নিয়মিত প্রকাশিত হতো। তবে, তিনি এও জানান যে, কয়েক বছর আগে এক মারাত্মক বন্যায় সে সমস্তই ভেসে গিয়েছে। পরক্ষণেই আমরা বুঝতে পারি, যে-বন্যার কথা বৃদ্ধ বলছেন, তা আসলে ঘটে গিয়েছে কুড়ি বছরেরও আগে। বারাণসীতে, সময় এভাবেই, একলপ্তে, ভেঙে দ্যায় শতক-দশকের সীমানা।
কেননা, সময় এই ছবির এক মুখ্য চরিত্র। যেমন, আরেক মুখ্য চরিত্র এর পটভূমি--বারাণসী--ভারতের প্রাচীনতম শহর। পৌরাণিক, প্রাচীন ও আধুনিক--এই ত্রিকাল এখানে এক বহুমুখী সংলাপে রত। আর এই সংলাপকে নানাভাবে ধরার চেষ্টা করেছেন কমল স্বরূপ। চবুতরায় জমায়েত কয়েকজন বৃদ্ধাকে তিনি দ্যাখান ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত ফালকের বিখ্যাত ছবি 'কালীয় মর্দন'। ও এই কাজে ব্যবহৃত হয় অ্যাপলের অত্যাধুনিক ল্যাপটপ। অথবা, গঙ্গার ঘাটে এক সাধু তাঁর মোবাইল ফোনে উপদেশ দ্যান ভক্তদের, আর ধীরে ধীরে ঘাটের শটটি ডিজলভ করে একশো বছর আগে তৈরি কোনো এক পৌরাণিক ছবির দানা-অলা শাদা-কালো দৃশ্যের ভিতর। গঙ্গার জলের ওপর প্রক্ষিপ্ত এক দৃশ্যে জল থেকে উঠে আসেন শেষনাগের পিঠে আসীন নারায়ণ--আঙুলে পিচবোর্ড-জাতীয় শস্তা উপাদানে তৈরি সুদর্শন চক্র, যা ঘুরতে ঘুরতে থেমে যাচ্ছে প্রায়শই।ফালকের স্বেচ্ছা-নির্বাসনকে কমল বারেবারেই তুলনা করেছেন রাজা হরিশচন্দ্রের রাজ্যত্যাগ ও নির্বাসনের সঙ্গে। যে-হরিশচন্দ্র আবার ফালকের প্রথম চলচ্চিত্রের মুখ্য চরিত্রও বটে। সিনেমার বর্ণাঢ্য জগতকে বিদায় জানিয়ে থিয়েটারের রঙ্গমঞ্চে দাদাসাহেব ফালকের সাময়িক পদার্পণ কি, তাহলে, হরিশচন্দ্রের ক্ষত্রিয়ত্ব ত্যাগ ও কালু ডোমের শিষ্যত্ব গ্রহণের মতো এক প্রান্তিক অবস্থানকে চিহ্নিত করে? এর উত্তর খুঁজে নেওয়ার দায় অবশ্য দর্শকের উপরেই বর্তাবে। কমল স্বরূপ শুধু আমাদের দ্যাখান পৌরাণিক কালু ডোমের বর্তমান বংশধরদের, যারা এ-বিষয়ে মুখ খুলতে পূর্ণত নারাজ। অন্যত্র এও দেখি যে এক জটাজুটধারী সাধু ব্যাখ্যা করছেন বিষ্ণু ও মহেশ্বরের ষড়যন্ত্রে ব্রহ্মার মুণ্ডচ্ছেদ, এবং গোটা ভারতবর্ষে তাঁর উপাসনা নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি। প্রান্তিক দেবতা ব্রহ্মা (যিনি আবার বিষ্ণুর সৃষ্টিকর্তাও বটে) বনাম বিষ্ণু-মহেশ্বরের এই দ্বন্দ্বকে কমল থিয়েটার ও সিনেমার বিরোধ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছেন কি না, সে-বিষয়ে আমাদের আলগা সন্দেহ থেকেই যায়। কেননা সিনেমার শুরুর একটি দৃশ্যে আমরা থিয়েটারের সেটের মধ্যে বসে কমলকে বলতে শুনেছি, সিনেমার চেয়ে থিয়েটার অনেক বেশি যাদুকরী। ও এই সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে তিনি আরো বলেন, “যখন অল্পবয়সে আজমেরে আমরা বড়ো বড়ো রাশিয়ান লেখকদের লেখা পড়তুম, য্যামন, দস্তয়েভস্কি, আর পড়তাম মস্কোর কোনো সেতু কিংবা সেন্ট পিটার্সবুর্গের কোনো এক নালার বর্ণনা, তখন আমরা আজমেরেরই কোনো ছোটো সেতু কিংবা নালার মতো করে সেসব কল্পনা করে নিতুম। থিয়েটারেও, কল্পনার সেই অবকাশ থেকে যায়। কিন্তু সিনেমায় তোমাকে আসল জিনিশটাই দ্যাখাতে হবে, নইলে চলবে না।”

শুধু ফালকের সন্ধান নয়, 'রঙ্গভূমি' প্রকৃতপ্রস্তাবে ধরে রাখতে চায় দৃশ্যের বিবর্তন—ফালকের প্রাগৈতিহাসিক প্রকৌশল থেকে বর্তমানের ডিজিটাল ভিডিও-শাসিত দৈনন্দিন অবধি। দৃশ্যের অভিনব সংস্থাপণ ও জাক্সটাপজিশনে তৈরি হয় অভাবনীয় সব মুহূর্ত। বৃহৎ পর্দায় প্রক্ষিপ্ত ফালকে ও তাঁর সহকর্মীদের স্থিরচিত্রের সামনে বসে থাকা কমল স্বরূপকে, আলো-ছায়ার রহস্যে, সেই ছবিরই এক অংশমাত্র বলে মনে হয়। অথবা, প্রাচীন হাভেলির দেয়ালে প্রক্ষিপ্ত হয় ফালকের চলচ্চিত্রের অংশবিশেষ। এমনকী, পুরোনো সিনেমা ও থিয়েটারের ধরণে, এই ছবিতে সেট-হিসেবে ব্যবহৃত হয় বারাণসী্র ঘাটের একটি ছোটো কিন্তু অবিকল প্রতিরূপ। এই সেটে গৃহীত দৃশ্যাবলী ও প্রকৃত লোকেশনে গৃহীত দৃশ্যের ধারাবাহিক ব্যবহারে ভেঙে যায় নির্মিত ও প্রকৃত বাস্তবের মধ্যবর্তী ভেদরেখাটি। হয়তো তা এই সত্যের দিকেই অঙ্গুলিনির্দেশ করে যে, ব্যক্তি বা সমষ্টির স্মৃতির আসলে কোনো বাস্তবতা নেই, বরং প্রতি মুহূর্তে তা নতুন করে নির্মিত হয়, ও বর্তমানের অভিঘাতে ধীরে ধীরে পালটে যেতে থাকে।
এসব সত্ত্বেও, শুরুতে যে-কথাটি বলা হয়েছিল—যে এই ছবি আসলে ফালকের আত্মজৈবনিক নাটক 'রঙ্গভূমি'র উপর আধারিত—তার মধ্যে বিন্দুমাত্র অসত্য বা অতিকথন নেই। সেই নাটকের মঞ্চনির্দেশ আর সংলাপ ক্রমাগত আমাদের পড়ে শোনানো হয়—কখনো মুখোমুখি, কখনো বা নেপথ্যভাষণের ঢঙে। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র সঙ্গীত রাও, রচয়িতা দাদাসাহেব ফালকে আর ফালকের পদাঙ্ক-অনুসরণকারী কমল স্বরূপ ধীরে ধীরে এক ও অভিন্ন হয়ে ওঠেন। কেননা, এই তিনটি চরিত্রের সমস্ত সন্ধানের অভিমুখ শেষ অবধি এক—জীবন ও শিল্পের মধ্যে সংযোগ-নির্মাণ।
তবে, মনে রাখা উচিত যে, এই ছবির সমস্ত সন্ধানই শেষ হয় কানাগলিতে। কিছু সম্ভাব্য তথ্যসূত্র ও অনুমান ছাড়া, কোথাও ফালকের চিহ্নমাত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো, বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীতকে বোঝার যে-কোনো প্রকল্পই আসলে একেকটি মহৎ ব্যর্থতার আখ্যান। যেহেতু স্মৃতি বদলে যেতে থাকে ক্রমাগত, যেহেতু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় তার তাৎপর্য আর অভিঘাত, সেইহেতু তার ভিত্তিতে অতীতের পুনর্নিমাণ, বোধ হয়, সযত্নলালিত রূপকথা ছাড়া আর কিছু নয়। বারাণসীর একটি প্রাচীন পত্রিকার দফতরে গিয়ে যখন কমল স্বরূপের সহকর্মিণী দেখতে চান ১৯২০ সালের পত্রিকার ফাইলগুলি, তখন পত্রিকার এক কর্মী খুব বিরক্তির সঙ্গে জানান যে, তাঁরা এইসব গবেষকদের কোনোভাবেই সাহায্য করতে প্রস্তুত নন। কেননা, তারা পুরোনো ফাইল দ্যাখার ছলে ছিঁড়ে নেয় পাতার টুকরো, নষ্ট করে মূল্যবান নথি। ইতিহাস-সংক্রান্ত যেকোনো গবেষণার মূলগত অসারত্ব এই একটিমাত্র সংলাপে মূর্ত হয়ে ওঠে। যদিও তাই বলে, অনুসন্ধিৎসুর যাবতীয় প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যায় না, যদি অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সংঘাতে বদলে যায় তার দৃষ্টিভঙ্গী, তার ব্যক্তিগত বিশ্বদর্শন।আর, সেটাই এই ছবির মুখ্য অভিপ্রায়। একটি অতীত কালখন্ডকে, দৃশ্য ও তার ক্রমবিবর্তনকে, ইতিহাস-উপকথা-পুরাণের অনবরত চলাচলকে বর্তমানের চোখ দিয়ে দ্যাখা, আর সেই দ্যাখার সূত্রে এক নতুন সিনেমা-ভাষার নির্মাণ ‘রঙ্গভূমি’র সবচেয়ে বড়ো সার্থকতা।

No comments:
Post a Comment